আপনার যে কোন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন!01958666697 তথ্য বহুল ইসলামিক সব আলোচনা পেতে আমাদের সাথেই থাকুন! ভর্তি চলছে, ক্বারী ইয়াকুব আলী রহ. ইসলামিয়া মাদরাসা,যোগাযোগ:01609216916 🧬 জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এ নতুন বিপ্লব শুরু হতে যাচ্ছে...

সূরা আল-কদর (Surah Al-Qadr) এর ব্যাখ্যা এবং লাইলাতুলকদরের আলোচনা

লাইলাতুলকদর

 

লাইলাতুল কদরের মাস (شهر ليلة القدر)
রমজান মাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এই পবিত্র মাসেই মহিমান্বিত রাত 'লাইলাতুল কদর' রয়েছে। এটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি রাত। আল্লাহ তাআলা নিজেই এর নামকরণ করেছেন এবং এর উচ্চ মর্যাদা ঘোষণা করেছেন।
কদর' (القدر) শব্দের শাব্দিক অর্থ ও বিশ্লেষণ:
'কদর' قدر শব্দের কয়েকটি অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে:
১. বিচার ও ফয়সালা (القضاء والحكم): কদর মানে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ভাগ্য বা ফয়সালা।
২. পরিকল্পনা বা ব্যবস্থা (التدبير): কোনো কাজের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যেমন বলা হয়, তারা তাদের কাজের পরিকল্পনা করেছে।
৩. মর্যাদা ও মাহাত্ম্য (المكانة وعلو الشأن): অত্যন্ত সম্মানিত বা উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন হওয়া। যেমন আল্লাহ বলেন: "তারা আল্লাহর যথাযোগ্য মর্যাদা (কদর) দেয়নি।" অর্থাৎ তারা তাকে সঠিকভাবে সম্মান করেনি।
সারকথা: লাইলাতুল কদরকে এই নামে ডাকার কারণ হলো—এটি অত্যন্ত সম্মানিত রাত, এবং এই রাতে মানুষের পরবর্তী বছরের ভাগ্য বা ফয়সালা নির্ধারণ করা হয়।এই রাত সম্পর্কে প্রথমে সূরা আল-কদর (৯৭) এবং পরবর্তীতে সূরা আদ-দুখানের (৪৪) প্রথম দিকে আয়াত নাজিল হয়েছে।
১. সূরা আল-কদর (Surah Al-Qadr)
এটি নাজিল হওয়ার ধারাবাহিকতায় ২৫তম সূরা।
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ. إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ (١) وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ (٢) لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ (٣) تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ (٤) سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفالْقَدْرِ﴾
অনুবাদ: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে। নিশ্চয়ই আমি এটি (কোরআন) কদরের রাতে নাজিল করেছি। (১) আর আপনি কি জানেন কদরের রাত কী? (২) কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। (৩) সেই রাতে ফেরেশতারা এবং রূহ (জিবরাঈল আ.) তাদের রবের নির্দেশে প্রতিটি কাজের জন্য অবতীর্ণ হন। (৪) শান্তিই শান্তি, যা ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (৫)
২. সূরা আদ-দুখান (Surah Ad-Dukhan)
নাজিল হওয়ার ক্রম অনুসারে এটি ৬৪তম সূরা। এর শুরুতেই আল্লাহ তাআলা বলেন:
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ. حم (١) وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ (٢) إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ (٣) فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ (٤) أَمْرًا مِنْ عِنْدِنَا إِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ (٥) رَحْمَةً مِنْ رَبِّكَ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ (٦)
অনুবাদ: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে। হা-মীম। (১) শপথ এই সুস্পষ্ট কিতাবের। (২) নিশ্চয়ই আমি এটি এক বরকতময় রাতে নাজিল করেছি; আমি তো সতর্ককারী। (৩) এই রাতে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ফয়সালা করা হয়। (৪) আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে, আমি তো রাসূল পাঠিয়ে থাকি। (৫) আপনার রবের পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ; নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (৬)
লাইলাতুল কদরের নামকরণের কারণসমূহ
এই রাতকে 'লাইলাতুল কদর' বলার পেছনে বেশ কিছু অর্থ ও কারণ বিদ্যমান:
তদবীর বা ব্যবস্থাপনার রাত: এটি এমন এক রাত যেখানে মহাবিশ্বের সব কাজের পরিকল্পনা বা ব্যবস্থাপনা করা হয়।
উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের রাত: 'কদর' মানে মহান মর্যাদা বা শ্রেষ্ঠত্ব।
কোরআনের ভাষাগত বিশ্লেষণ (সূরা কদর)
সূরা কদরের প্রথম আয়াতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা।

انا انزلناه في ليلة القدر

(নিশ্চয়ই আমি এটি কদরের রাতে নাজিল করেছি)
১. কোরআনের নাম উল্লেখ না করা: এখানে 'কোরআন' শব্দটি সরাসরি না বলে সর্বনাম (ه 'ضمير') ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ এটি এতই সুপরিচিত ও মহান কিতাব যে, নাম না নিলেও বোঝা যায় এখানে কোরআনের কথা বলা হচ্ছে।
২. ' (ইন্না) انا শব্দের ব্যবহার: আল্লাহ এখানে 'আমি' না বলে 'আমরা' (সম্মানসূচক বহুবচন) ব্যবহার করেছেন তাঁর মহানুভবতা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের জন্য। যখন আল্লাহ নিজের কোনো মহান কাজের কথা উল্লেখ করেন, তখন তিনি এই সম্মানসূচক বহুবচন ব্যবহার করেন।
উদাহরণস্বরূপ আয়াতসমূহ:
إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ
(নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাজিল করেছি)।
إِنَّا أَنْزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ
(নিশ্চয়ই আমি তাওরাত নাজিল করেছি, যাতে ছিল হেদায়েত ও আলো)।
إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ
(নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি)

৩. কোরআনের আয়াতের বিশেষ অনুবাদ ও ব্যাখ্যা
ছবিতে সূরা আল-কদরের আয়াতের কিছু সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে:

إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ

অনুবাদ: "নিশ্চয়ই আমি এটি (কোরআন) কদরের রাতে নাজিল করেছি।"

ব্যাখ্যা: এখানে 'ইন্না' (আমরা) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে আল্লাহর মহিমা প্রকাশের জন্য। আর কোরআনের নাম সরাসরি না নিয়ে 'হু' (এটি) সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে কারণ এর মাহাত্ম্য সর্বজনবিদিত।

وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ

অনুবাদ: "আর আপনি কি জানেন লাইলাতুল কদর কী?"
ব্যাখ্যা: মুফাসসিরগণ বলেন, এই প্রশ্নের উদ্দেশ্য হলো—মানুষের জ্ঞান বা উপলব্ধি এই রাতের প্রকৃত মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব পুরোপুরি পরিমাপ করতে সক্ষম নয়। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এই রাতের প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শনের একটি পদ্ধতি

لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ

অনুবাদ: "লাইলাতুল কদর এক হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।"
ব্যাখ্যা: এর অর্থ হলো, এই এক রাতে ইবাদত করা অন্য এক হাজার মাস (যাতে লাইলাতুল কদর নেই) ইবাদত করার চেয়েও বেশি সওয়াব ও বরকতের কাজ।
আর কদরের রাতে কোরআন নাজিলের অর্থ হলো—কোরআন নাজিলের সূচনা রমজান মাসের কদরের রাতে হয়েছিল, অথবা পুরো কোরআন একবারে দুনিয়ার আকাশে কদরের রাতে অবতীর্ণ করা হয়েছিল। অতঃপর তা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে বিভিন্ন ঘটনা, প্রেক্ষাপট এবং শিক্ষামূলক প্রয়োজনে পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হয়েছে।
আল্লাহর বাণী: "রমজান মাস, যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে"—ব্যাখ্যা কুরআন ও আসমানী কিতাব নাযিলের প্রেক্ষাপট শিরোনামে অতিবাহিত হয়েছে।
আল্লাহর বাণী: "আর আপনি কি জানেন লাইলাতুল কদর কী?!!"।
"মা আদরাকা" (وما أدراك) একটি প্রশ্নবোধক বাক্য, যার অর্থ: আপনাকে কে জানাবে বা কোনো বিষয় আপনাকে এটি অবগত করবে?
"মা লাইলাতুল কদর" (ما ليلة القدر) এটিও একটি প্রশ্নবোধক বাক্য, যার মাধ্যমে এই রাতের প্রকৃত হাকিকত এবং এর মাহাত্ম্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে। অর্থাৎ: এই মহান ও মহিমান্বিত লাইলাতুল কদরের মর্যাদা কতটুকু? এটি একটি বিস্ময়সূচক প্রশ্ন যা লাইলাতুল কদরের বিশালত্বকে তুলে ধরে।
কোরআনের এই শৈলীটি এমন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় যেখানে সম্বোধনকৃত ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গভীরতা সম্পর্কে আগে থেকে অবগত নন, যতক্ষণ না তাকে জানানো হয়। এটি এই রাতের সুমহান মর্যাদার একটি অকাট্য প্রমাণ।
মুফাসসিরগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: অর্থাৎ আপনার জ্ঞান এই রাতের শ্রেষ্ঠত্ব, এর মর্যাদার শেষ সীমা এবং এর মাহাত্ম্যের চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবে না। পবিত্র কোরআনে এই ধরনের শৈলী বারবার ব্যবহৃত হয়েছে এবং এটি সম্মান প্রদর্শন, গুরুত্বারোপ এবং বিশালত্ব প্রকাশের একটি পরিচিত পদ্ধতি, যেমনটি মহান আল্লাহর বাণীতে পাওয়া যায়:
কুরআনের আয়াত (সূরা আল-হাক্কাহ):
الْحَاقَّةُ (١) مَا الْحَاقَّةُ (٢) وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْحَاقَّةُ (٣)
অনুবাদ: নিশ্চিত সত্য (১) নিশ্চিত সত্য কি? (২) আর আপনি কি জানেন নিশ্চিত সত্য কি? (৩)।
কুরআনে 'মা আদরাকা' (وَمَا أَدْرَاكَ) সমজাতীয় আরও কিছু উদাহরণ:
وَمَا أَدْرَاكَ مَا سَقَرُ
(আর আপনি কি জানেন 'সাকার' কি?)
وَمَا أَدْرَاكَ مَا يَوْمُ الْفَصْلِ
(আর আপনি কি জানেন ফয়সালার দিন কি?)
وَمَا أَدْرَاكَ مَا يَوْمُ الدِّينِ. ثُمَّ مَا أَدْرَاكَ مَا يَوْمُ الدِّينِ
(আর আপনি কি জানেন প্রতিদান দিবস কি? আবার বলি, আপনি কি জানেন প্রতিদান দিবস কি?)
وَمَا أَدْرَاكَ مَا سِجِّينٌ
(আর আপনি কি জানেন 'সিজ্জীন' কি?)
وَمَا أَدْرَاكَ مَا عِلِّيُّونَ
(আর আপনি কি জানেন 'ইল্লিয়্যীন' কি?)
وَمَا أَدْرَاكَ مَا الطَّارِقُ
(আর আপনি কি জানেন 'আত্ব-তারিক' কি?)
وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْعَقَبَةُ
(আর আপনি কি জানেন 'আল-আকাবা' কি
যদি কোনো মাস ৩০ দিনের হয়, তবে লাইলাতুল কদর ৩০ হাজার দিনের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি এই রাতে আল্লাহর ইবাদত, জিকির, দোয়া ও অন্যান্য নেক আমল করবে, আল্লাহ তার জন্য তার আমলনামায় ততটুকু সওয়াব লিখে দেবেন যা তার সারা জীবন (আশি বছর বা তার বেশি) ইবাদত করলেও অর্জিত হতো না। এক হাজার মাস হলো ৮৩ বছর ৪ মাস, যা অধিকাংশ মানুষের গড় আয়ু।
আল্লাহ তায়ালা একে প্রতিযোগিতার একটি মাধ্যম বানিয়েছেন যাতে বান্দারা পূর্বের গুনাহ ও ত্রুটি মোচনের সুযোগ পায়। আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন সময় ও স্থানকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। যেমন:

  •  হারাম শরীফে (মক্কা) নামাজের সওয়াব ১ লক্ষ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়
  •  মসজিদে নববীতে (মদিনা) নামাজের সওয়াব ১০ হাজার গুণ বৃদ্ধি পায় (কোনো কোনো বর্ণনায় ১ হাজার গুণ)।
  •  মসজিদুল আকসায় নামাজের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
  • একাকী নামাজের চেয়ে জামাতে নামাজ পড়া ২৫ বা ২৭ গুণ বেশি সওয়াবের।
  • রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহচর্য লাভ এমন এক মর্যাদা যার কোনো তুলনা

تنزل الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ
অনুবাদ: "ফেরেশতারা এবং রূহ তথা (জিবরাঈল আ.) তাদের রবের নির্দেশে প্রতিটি কাজের জন্য সেই রাতে অবতীর্ণ হন।"
এখানে আল্লাহ তাআলা বর্ণনা করছেন যে, লাইলাতুল কদরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ফেরেশতারা আকাশ থেকে পৃথিবীর আকাশে এবং জমিনে অবতরণ করেন, যাতে তারা মুমিনদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এই মহিমান্বিত কল্যাণের সাক্ষ্য হতে পারেন।
'তানাজ্জালু' (تَنَزَّلُ) শব্দটি এখানে একটি ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে। অর্থাৎ ফেরেশতাদের এই অবতরণ একের পর এক দলবদ্ধভাবে চলতে থাকে। একদল ফেরেশতা আসার পর অন্য দল আসে এবং এভাবে ফজর পর্যন্ত তারা মুমিনদের কল্যাণ প্রত্যক্ষ করতে থাকে।
ইমাম বায়হাকী 'শুআবুল ঈমান'-এ আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন (হাদীস):
قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «إِذَا كَانَ لَيْلَةُ الْقَدْرِ نَزَلَ جِبْرِيْلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ فِي كَبْكَبَةٍ (١) مِنَ الْمَلَائِكَةِ يُصَلُّونَ عَلَى كُلِّ عَبْدٍ قَائِمٍ أَوْ قَاعِدٍ يَذْكُرُ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ، فَإِذَا كَانَ يَوْمُ عِيْدِهِمْ بَاهَى بِهِمْ مَلَائِكَتَهُ فَقَالَ: يَا مَلَائِكَتِي، عَبِيدِي وَإِمَائِي قَضَوْا فَرِيضَتِي عَلَيْهِمْ ثُمَّ خَرَجُوا يَعِجُّونَ إِلَى الدُّعَاءِ، وَعِزَّتِي وَجَلَالِي وَكَرَمِي وَعُلُوِي وَارْتِفَاعِ مَكَانِي لَأُجِيبَنَّهُمْ، فَيَقُولُ: ارْجِعُوا فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ وَبَدَّلْتُ سَيِّئَاتِكُمْ حَسَنَاتٍ» قَالَ: «فَيَرْجِعُونَ مَغْفُورًا لَهُمْ».
(১) كبكبة أي: جماعة.
অনুবাদ:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যখন লাইলাতুল কদর আসে, তখন জিবরাঈল (আ.) ফেরেশতাদের একটি বিশাল দলের সাথে জমিনে অবতরণ করেন। তারা এমন প্রত্যেক বান্দার জন্য দোয়া করতে থাকেন যারা দাঁড়িয়ে বা বসে মহান আল্লাহর জিকিরে মগ্ন থাকে। অতঃপর যখন তাদের ঈদের দিন আসে, তখন আল্লাহ তাঁর ফেরেশতাদের কাছে ঐ বান্দাদের নিয়ে গর্ব করেন এবং বলেন: হে আমার ফেরেশতারা! আমার দাস ও দাসীরা তাদের ওপর অর্পিত আমার ফরজ দায়িত্ব পালন করেছে এবং প্রার্থনায় রত হয়ে বের হয়েছে। আমার সম্মান, মহিমা, দানশীলতা এবং সুউচ্চ মর্যাদার শপথ! আমি অবশ্যই তাদের ডাকে সাড়া দেব। অতঃপর আল্লাহ বলেন: তোমরা ফিরে যাও, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি এবং তোমাদের মন্দ কাজগুলোকে নেকিতে পরিণত করে দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: অতঃপর তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত অবস্থায় ফিরে যায়।"
ফেরেশতাদের এই অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, মুমিনদের জন্য ইবাদতের এই বিশেষ সময়গুলো আকাশ ও জমিনের সব সৃষ্টির জন্য এক মহোৎসবের মতো।"
"যেহেতু রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পক্ষ থেকে আসা সংবাদে এটি প্রমাণিত।
সুতরাং এই ইবাদাতের আয়োজন এবং সওয়াব প্রাপ্তির এই মহান উৎসব ও কল্যাণ থেকে কোনো কিছুই বিমুখ
থাকে না, আকাশ ও পৃথিবীর ফেরেশতা এবং মুৃমিন জিন ও ইনসান সবারই জন্য। অন্যান্য সৃষ্টি জীবও এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়না।
কেবল কাফের, একগুঁয়ে অবাধ্য অপরাধী এবং শয়তানরা ব্যতীত। ফলে তারা এই বরকতময় ইবাদতের সওজন এবং এর সুমহান ঐশ্বরিক কল্যাণ থেকে বঞ্চিত থাকে।
ফেরেশতারা যখন অবতীর্ণ হয়, তখন তারা তাদের রবের নির্দেশেই অবতীর্ণ হয়। তারা তাদের নিজস্ব ইচ্ছায় অবতীর্ণ হয় না। তাদের সাথে 'রূহ' অর্থাৎ জিবরাঈল (আ.)-ও অবতীর্ণ হন (সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী)। জিবরাঈল (আ.)কে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে তাঁর সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য; কারণ তিনি একমাত্র আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া অবতীর্ণ হন না।
আল্লাহর বাণী  كُلِّ أَمْرٍ
অনুবাদ: "প্রতিটি কাজের জন্য।"
অর্থাৎ: তারা তাদের দায়িত্ব এবং সেইসব বার্তা বহন করেন যা আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিজগতের ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।
কুরআনকে নিয়ে যারা গভীরভাবে গবেষণা করেন এমন ব্যক্তি আল্লাহর এই বাণীতে এর ব্যাখ্যা খুঁজে পেতে পারেন, যা তিনি সূরা আদ-দুখানের (৪৪) শুরুতে লাইলাতুল কদর প্রসঙ্গে বলেছেন:
আল্লাহর বাণী (কুরআন):
فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ (٤) أَمْرًا مِنْ عِنْدِنَا
অনুবাদ: "এই রাতে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ফয়সালা করা হয়। (৪) আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে।"
অর্থাৎ: এই রাতে লওহে মাহফুজ থেকে অমোঘ ফয়সালাসমূহ পৃথক করা হয়, যা আগামী বছরের পরবর্তী লাইলাতুল কদর পর্যন্ত সংঘটিত হবে।
আর এই (ফয়সালা) লওহে মাহফুজে যা লেখা আছে তার ভিত্তিতেই আল্লাহর নির্দেশে সম্পন্ন হয়।
যখন আমরা এই মোবারক রাত অতিবাহিত করি

তখন অমাদের মনে রাখতে হবে যে, ফেরেশতাদের সর্বোচ্চ আসরের সাথে যুক্ত থেকে রবকে স্মরণ করছি অর্থাৎ তারা আল্লাহ তায়ালার আদেশ পালন করে ইবাদাত করছে আর আমরা এই রাতের সমস্ত বরকত এবং কল্যাণের সাক্ষী হচ্ছি।

ফেরেশতারা লওহে মাহফুজে সিদ্ধান্ত আল্লাহর অমোঘ নির্দেশগুলো বহন করে আনেন এবং জমিনের ফেরেশতাদের কাছে পৌঁছে দেন যাতে তারা তা কার্যকর করতে পারে।
অর্থাৎ: সর্বোচ্চ আসরের (ফেরেশতাদের) প্রতিনিধিরা, যাদের নেতৃত্বে আছেন রূহ অর্থাৎ জিবরাঈল (আ.), তারা তাদের রবের নির্দেশে এই মোবারক রাতে অবতীর্ণ হন।"

ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা

লাইলাতুল কদরের নামকরণের কারণ এবং এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রখ্যাত সাহাবী ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে এই বর্ণনাটি উল্লেখ করা হয়েছে:
فَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يُقَدِّرُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ مَا يَكُونُ فِي كُلِّ تِلْكَ السَّنَةِ مِنْ مَطَرٍ وَرِزْقٍ وَإِحْيَاءٍ وَإِمَاتَةٍ، إِلَى مِثْلِ هَذِهِ اللَّيْلَةِ مِنَ السَّنَةِ الْآتِيَةِ.
অনুবাদ: "ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা লাইলাতুল কদরে পরবর্তী বছরের এই রাত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে—যেমন বৃষ্টি, রিযিক, জীবন দান এবং মৃত্যু—তার সবকিছু নির্ধারণ (তদবীর) করেন।"

আল্লাহর বাণী (কুরআন):
سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ
অনুবাদ: "শান্তিই শান্তি, যা ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।"

আল্লাহ এই মোবারক রাতটিকে 'সালাম' বা শান্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ: এটি এক নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ রাত—যেখানে কোনো ক্রোধ নেই, কোনো প্রতিশোধ নেই, কোনো ঝগড়া বা বিবাদ নেই। ফেরেশতারা এই রাতে ইবাদত ও নিরাপত্তার উৎসব পালন করে। আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তির কোনো নির্দেশ এই রাতে কার্যকর হয় না। এই শান্তি জিন ও ইনসানের সকল মুকাল্লিফ (যাদের ওপর শরীয়ত অর্পিত) বান্দাদের জন্য আকাশ ও জমিনে ছড়িয়ে পড়ে।
এই রাতের এই বিশেষ অবস্থা ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। مطلع الفجر এই শব্দ দ্বারা
প্রতীয়মান হয় যে, এই রাতটি পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিমের সকল প্রান্তেই আবর্তিত হয়। পৃথিবীর প্রতিটি জনপদের মানুষ তাদের নিজ নিজ অবস্থান অনুযায়ী এই রাতের শুরু ও শেষ লাভ করে। কারণ রাত ও দিন পৃথিবীতে পর্যায়ক্রমে আসে এবং সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর নিজ অক্ষের ওপর আবর্তনের ফলে বিভিন্ন স্থানে সময়ের পার্থক্য ঘটে।
   

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ